পণ্য গাইড · দাম

হাতির দাঁতের শীতল পাটি: আসল গ্রেড চেনার উপায় ও দাম

সুনামগঞ্জের ধর্মপাশায় ২০২৩ সালে এক পাটিয়ালের কাছে প্রথম হাতির দাঁতের পাটি হাতে তুলেছিলাম। উনি বললেন, "ধরেন, টের পাবেন।" টের পেয়েছিলাম। আঙুল বোলালে মনে হয় যেন রেশমি কাগজের উপর দিয়ে চলছে, কিন্তু ঠান্ডা। সাধারণ শীতল পাটির সাথে এই অনুভূতির তুলনা হয় না।

প্রকাশিত: ২১ জুন, ২০২৬৬ মিনিট পড়ার সময়

"হাতির দাঁত" নামটা কোথা থেকে

নামটা রূপক। হাতির দাঁত মানে এখানে হাতির দাঁতের মতো সাদা, মসৃণ, ঘন। মুর্তা গাছের চিড় যখন এত সরু যে এক মিলিমিটারের নিচে নামে, তখন বোনা পাটির রঙ ও টেক্সচার পালিশ করা আইভরির কাছাকাছি যায়। পাটিয়ালরা এই গ্রেডকে আলাদা করতে এই নাম দেন।

বাজারে বেশিরভাগ শীতল পাটিতে চিড়ের চওড়া দেড় থেকে দুই মিলিমিটার। কারণ সরু চিড় তৈরি করতে বেশি সময় লাগে, ভাঙার ঝুঁকি বেশি, এবং বোনার সময় মনোযোগ বেশি দরকার। ৩ ফুট × ৫ ফুটের একটা সাধারণ পাটিতে যেখানে তিন দিন লাগে, হাতির দাঁতের পাটিতে সেই একই মাপে পাঁচ থেকে সাত দিনও লাগতে পারে।

তাই দাম বেশি।

কেন রঙ থাকে না

হাতির দাঁতের পাটিতে সাধারণত রঙিন নকশা দেওয়া হয় না। এটা ঐতিহ্যের সিদ্ধান্ত, কিন্তু কারণটা ব্যবহারিকও। এত সরু চিড়ে রং সমানভাবে বসানো কঠিন — ছোপ ছোপ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই পাটিয়ালরা প্রাকৃতিক সাদা রাখেন।

ডিজাইন তাহলে কোথা থেকে আসে? বুননের কাঠামো থেকে। চিড়ের ঘনত্বে, পাকানোর কোণে সামান্য পরিবর্তনে, আলো কীভাবে পড়ছে তার উপর নির্ভর করে সূক্ষ্ম প্যাটার্ন ফুটে ওঠে। সরাসরি আলোয় ধরলে এই নকশা স্পষ্ট দেখা যায়, তির্যক আলোয় আরও সুন্দর।

অনেকে মনে করেন সাদা মানে সস্তা। উলটো। রঙিন নকশি পাটির দাম হাতির দাঁতের পাটির চেয়ে কম হতে পারে যদি চিড় মোটা হয়। দামের আসল নির্ধারক চিড়ের মাপ, রঙ নয়।

আসল হাতির দাঁতের পাটি কীভাবে চিনবেন

তিনটা পরীক্ষা আছে, তিনটাই ঘরে করা যায়।

প্রথম: পাটিটা উলটে দেখুন। পেছনের দিকে চিড় আলাদাভাবে স্পষ্ট বোঝা যায়। মোবাইল ক্যামেরায় ক্লোজ-আপ তুলে মেপে নিন। এক মিলিমিটারের বেশি হলে হাতির দাঁতের গ্রেড না — যতই বিক্রেতা বলুক।

দ্বিতীয়: ভাঁজ করার চেষ্টা করুন। হাতির দাঁতের পাটি বেশ শক্ত, সহজে ভাঁজ হতে চায় না। সাধারণ পাটি নরম, ভাঁজে ভাঁজ পড়ে। এই পার্থক্য হাতেই বোঝা যায়।

তৃতীয়: একই সাইজের দুটো পাটি পাশাপাশি তুলুন। হাতির দাঁতেরটা ভারী হবে। চিড়ের ঘনত্ব বেশি বলে ওজন বাড়ে। এই তুলনা বাজারে গিয়ে করার সুযোগ থাকলে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা।

দাম কত হওয়া উচিত

সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা বা হবিগঞ্জের বানিয়াচং থেকে সরাসরি আনলে ৩ ফুট × ৫ ফুটের একটা ভালো হাতির দাঁতের পাটির দাম ৩,৫০০ থেকে ৭,০০০ টাকার মধ্যে পড়ে। বিশেষ ঘন বুনন বা বড় সাইজের হলে ১২,০০০ টাকাও ছাড়িয়ে যায়।

ঢাকার বসুন্ধরা সিটির হস্তশিল্প দোকানে বা আরংয়ে একই মানের পাটি দ্বিগুণ দামে পাওয়া যায় — মূল দামের উপর বড় মার্জিন যোগ হয়। কিনলে ভুল হবে না, কিন্তু দামটা জেনে কিনুন।

অনলাইনে "হাতির দাঁতের পাটি" লিখলে দেখবেন অনেক পণ্য আসে ১,৫০০ থেকে ২,০০০ টাকায়। এই দামে সাধারণ গ্রেডই পাওয়া যায়। চিড়ের মাপ না লেখা থাকলে জিজ্ঞেস করুন। জবাব না পেলে কিনবেন না।

কারিগর কমছেন

ধর্মপাশায় ২০২৩ সালে যে পাটিয়ালের কাছ থেকে পাটি কিনেছিলাম, উনি বললেন গ্রামে আগে সাত পরিবার হাতির দাঁতের পাটি বানাতেন। এখন তিনজন। কারণ সময় বেশি লাগে, দাম আর উপযুক্ত মনে হয় না নতুন প্রজন্মের কাছে।

UNESCO ২০১৭ সালে শীতল পাটি শিল্পকে Intangible Cultural Heritage-এর তালিকায় রেখেছে। কিন্তু তালিকায় থাকলেই কারিগর থাকেন না। হাতির দাঁতের গ্রেড টিকিয়ে রাখতে হলে কারিগরের পাটির দাম বাজারে উঠতে হবে। তাই আমরা এই গ্রেডকে সস্তায় বিক্রি করি না।

শীতল পাটির বিস্তারিত গাইড

হাতির দাঁতের পাটির পাশাপাশি নকশি পাটি, ডিজাইনের নাম, দামের তুলনা এবং সিলেটের পাটি কোথায় কিনবেন সব পাবেন শীতল পাটি গাইড-এ। কারুবাড়িতে প্রতিটি পাটির পাতায় চিড়ের মাপ ও কারিগরের নাম দেওয়া থাকে।

এই লেখা সম্পর্কে

লেখক: কারুবাড়ি টিম . তথ্যসূত্র: সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা ও হবিগঞ্জের বানিয়াচং পাটিয়ালদের সাথে সরাসরি কথোপকথন (২০২৩), UNESCO ICH nomination file (2017)। ভুল তথ্য পেলে hello@karubari.com-তে জানান। শীতল পাটির বিস্তারিত: শীতল পাটি গাইড