ডিজাইন · ঐতিহ্য
শীতল পাটি ডিজাইন: নকশি পাটির মোটিফ ও তাদের নাম
শাপলা, তারা, নয়নতারা, ময়ূর। মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার এক পাটিয়ালের কাছে প্রথম এই নামগুলো শুনেছিলাম। উনি পাটির বুননের ধরন বোঝাচ্ছিলেন, এবং তখন আমি বুঝলাম যে বেশিরভাগ মানুষ শীতল পাটিকে শুধু সাদা বোনা মাদুর ভাবে। আসলে সিলেটের পাটিশিল্পে শত বছরের ডিজাইন পরম্পরা আছে, এবং প্রতিটি নকশার একটা আলাদা নাম।
তিন ধরনের শীতল পাটি ডিজাইন
শীতল পাটির ডিজাইন মূলত তিন ভাগে পড়ে।
প্রথমটা চিকনাই পাটি। এটা সবচেয়ে পরিচিত — সাদা বা হালকা রঙের চিড় দিয়ে সরলরেখায় বোনা। নকশা বলতে শুধু বুননের জ্যামিতি, আলাদা রঙ বা মোটিফ নেই। বাজারে বেশিরভাগ "শীতল পাটি" এই শ্রেণীর। চিকনাই মানে মসৃণতা বোঝায় — চিড় যত সূক্ষ্ম, পাটি তত চিকনাই।
দ্বিতীয়টা নকশি পাটি। বাংলাদেশের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের নথিতেও এই নাম আছে। পাটিতে যখন ফুল, পাখি, জ্যামিতিক মোটিফ তুলে বোনা হয় তখন সেটা নকশি পাটি। রঙিন চিড় ব্যবহার করে এই নকশা তৈরি হয় — লাল, সবুজ, কালো। একটা ভালো নকশি পাটি তৈরিতে পাটিয়ালকে আগে পুরো ডিজাইনটা মাথায় রাখতে হয়, কারণ বুননের সময় ভুল সংশোধনের সুযোগ নেই।
তৃতীয়টা জামদানি পাটি। নাম দেখে মনে হতে পারে জামদানি শাড়ির মতো। মিলটা আছে — উভয় ক্ষেত্রেই মূল কাঠামোর ভেতরে পৃথক সুতো বা চিড় দিয়ে নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়। জামদানি পাটির উৎপাদন সবচেয়ে কম। অনেক পাটিয়ালই এখন এটা বানান না।
ঐতিহ্যবাহী মোটিফের নাম
নকশি পাটির মোটিফগুলোর নাম বাংলাদেশের লোকশিল্পের সাথে মিলে যায়। কিছু নাম শুনলে চেনা মনে হবে।
- শাপলা — জাতীয় ফুলের নকশা। সাদা পটভূমিতে লাল বা সবুজ চিড়ে বোনা পদ্মের মতো আকার।
- তারা — আট বা ছয় বাহুর তারা। জ্যামিতিক, প্রতিসাম্যিক। সহজ ডিজাইনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
- নয়নতারা — তারার একটা জটিল রূপ, পাঁচ পাপড়ির ফুল। নয়নতারা ফুল থেকে নাম।
- ময়ূর — ময়ূরের পেখমের নকশা। রঙিন চিড়ে তৈরি, তৈরি করতে সময় বেশি লাগে।
- টিক্কা — বিন্দু বা ডটের ছন্দময় বিন্যাস। ছোট মোটিফ, ঘন করে সাজানো।
- সোনামুড়ি — সোনালি রঙের চিড়ে তৈরি সীমানা বা বর্ডার নকশা। পাটির কিনারায় ব্যবহার।
- আরুয়া — সরল লম্বা রেখার নকশা, কোনো রঙিন চিড় নেই। চিকনাই পাটির উন্নত সংস্করণ।
- সিকি / টাকা / আধলী — এগুলো আসলে পাটির সাইজ বা ইউনিটের নাম, ডিজাইনের না। তবে পুরনো পাটিয়ালরা মাঝে মাঝে এই নামে নির্দিষ্ট বুনন প্যাটার্নকেও বোঝান।
একটা কথা বলে রাখি — এই নামগুলো সব জায়গায় একই থাকে না। হবিগঞ্জের পাটিয়াল যেটাকে "নয়নতারা" বলেন, সুনামগঞ্জে সেটা অন্য নামে পরিচিত হতে পারে। মৌখিক পরম্পরায় চলে আসা শিল্পে এটা স্বাভাবিক।
রঙিন পাটি বনাম সাদা পাটি: পার্থক্য কোথায়?
রঙিন নকশি পাটিতে মুর্তার চিড় বুনন শুরুর আগেই রং করা হয়। শুকনো চিড়কে রঙ-মেশানো পানিতে ডোবানো হয়, তারপর আবার শুকানো। আগে প্রাকৃতিক উপকরণ ছিল — হলুদ গাছ, নিম পাতা, মেহেদি। এখন বেশিরভাগ পাটিয়াল সিন্থেটিক ডাই ব্যবহার করেন, কারণ সেটা সস্তা এবং রঙ বেশি থাকে।
সাদা বা প্রাকৃতিক রঙের পাটি মানেই কিন্তু সাধারণ না। হাতির দাঁতের পাটি যে সর্বোচ্চ শ্রেণী, সেটা সাধারণত রঙহীন। ডিজাইন আসে বুননের কাঠামো থেকে, চিড়ের পুরুত্ব আর ঘনত্ব থেকে। ১ মিলিমিটারের কম চওড়া চিড়ে বোনা সাদা পাটি, যেটায় আলো পড়লে প্যাটার্ন ফুটে ওঠে, সেটা রঙিন নকশার চেয়ে অনেক বেশি দামি।
তার মানে হলো: দেখতে যদি সাদামাটা লাগে, দাম দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন না।
কোন ডিজাইন এখন সবচেয়ে বিরল?
জামদানি পাটি। এবং ময়ূর মোটিফের উচ্চ-কাউন্ট নকশি পাটি।
জামদানি পাটির বুনন কৌশল জানা কারিগরের সংখ্যা এখন হাতে গোনা। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে কয়েকজন আছেন বলে জানি, কিন্তু তাদের বেশিরভাগেরই বয়স ষাটের ওপরে এবং শিষ্য নেই। আরেক দশকে এই ডিজাইন অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে।
ময়ূর মোটিফের পাটি বিরল কারণ ময়ূরের পেখমের রঙবিন্যাস তৈরি করতে অনেক ধরনের রঙিন চিড় একসাথে ব্যবহার করতে হয়, এবং পাটিয়ালকে পুরো প্যাটার্নটা মাথায় রেখে সমান্তরালে তিনটি চিড়-সিকোয়েন্স নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। একটা ৩ ফুট × ৪ ফুট ময়ূর পাটিতে ৩ থেকে ৪ সপ্তাহ লাগে।
শীতল পাটি কিনতে চান?
ডিজাইন ছাড়াও দাম, আসল-নকল চেনার উপায়, হাতির দাঁতের পাটির কথা আরও বিস্তারিত পাবেন শীতল পাটি গাইড-এ। কারুবাড়িতে যাচাইকৃত সিলেটি পাটিয়ালদের পাটি পাওয়া যায়, কারিগরের নাম ও গ্রাম সহ।
এই লেখা সম্পর্কে
লেখক: কারুবাড়ি টিম . তথ্যসূত্র: মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের পাটিয়াল কারিগরদের সাথে কথোপকথন, UNESCO ICH nomination file (2017), বাংলাদেশ সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের নকশি পাটি নথি। ভুল তথ্য পেলে hello@karubari.com-তে জানান। শীতল পাটির বিস্তারিত: শীতল পাটি গাইড।